বিজ্ঞান সাক্ষ্য দেয়

গণিত স্রষ্টার অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়

মহাবিশ্ব, প্রোটিন, ডিএনএ ও জীবকোষের উৎপত্তি সম্পর্কে সম্ভাবনার হিসাব কী বলে? স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে উত্থাপিত গাণিতিক যুক্তিগুলো জানুন।

গণিত স্রষ্টার অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়

“আল্লাহ আছেন”—এটি একটি গাণিতিক সত্য

“আল্লাহ আছেন এবং তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন”—গাণিতিকভাবে এই বক্তব্য “১ + ১ = ২” বলার মতোই নির্ভুল। আমাদের হাতে থাকা অগণিত প্রমাণ, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি থেকে পাওয়া প্রমাণ দেখিয়েছে, স্রষ্টার অস্তিত্ব, তাঁর সর্বজ্ঞতা ও সর্বশক্তিমত্তা এমন সত্য, যা কোনো সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ অস্বীকার করতে পারেন না।
আশ্চর্যের বিষয়, আমরা প্রায়ই এমন মানুষের দেখা পাই, যাঁরা এই বাস্তবতা অস্বীকার করেন এবং নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কে অযৌক্তিক ধারণার আশ্রয় নেন।

অহংকার প্রকাশ করে মানুষ আল্লাহর পথ থেকে সরে যায় এবং শেষ পর্যন্ত দুর্দশা ও দুঃখে পতিত হয়।

তাঁদের এই মনোভাবের কারণ বৈজ্ঞানিকের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিকই বেশি। এ প্রসঙ্গে জার্মান নাস্তিক দার্শনিক ডিটার হাইনরিশ কেরলার (১৮৮২–১৯২১) প্রকাশ্য অহংকার নিয়ে বলেন: “ঈশ্বরের অস্তিত্ব গাণিতিকভাবে প্রমাণিত হলেও আমি তাঁকে চাই না, কারণ তিনি আমার মহত্ত্ব সীমিত করে দেবেন।”
অন্তর যে সত্য উপলব্ধি করে, তা অস্বীকার করা অহংকারেরই নামান্তর। অহংকার দেখিয়ে মানুষ আল্লাহর পথ থেকে সরে যায় এবং দুনিয়া ও আখিরাতে দুর্দশা ও দুঃখে পতিত হয়। এ কারণেই অহংকার মানুষের অন্যতম বড় শত্রু। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

যারা অন্যায়ভাবে জমিনে অহংকার করে বেড়ায়, আমি অচিরেই তাদেরকে আমার নিদর্শনসমূহ থেকে অবশ্যই ফিরিয়ে রাখবো।(৩৭) আর তারা সকল নিদর্শন দেখলেও তার ওপর ঈমান আনবে না এবং তারা সৎপথ দেখলেও সেটাকে পথ হিসেবে গ্রহণ করবে না। কিন্তু তারা ভ্রান্ত পথ দেখলেই সেটাকেপথ হিসেবে গ্রহণ করবে। এটা এ জন্য যে, তারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যারোপ করেছে এবং সে ব্যাপারে তারা গাফিল ছিল ।(৩৭) অর্থাৎ আমি তাদেরকে আমার কিতাবের আয়াতসমূহ বুঝতে এবং দুনিয়ার নিদর্শনসমূহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে দিবো না।কুরআন — সূরা Al-A'raaf (7:146)উৎস : QuranEnc.com — Bengali Translation - Rowwad Translation Center — v1.1.2

মূল আলোচনায় ফিরে আসি: স্রষ্টার অস্তিত্ব একটি গাণিতিকভাবে সুস্পষ্ট সত্য! কেন? কারণ আমাদের জটিল মহাবিশ্ব দৈব ঘটনার ফল হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য! কিন্তু সম্ভাবনা বলতে কী বোঝায়?
কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটার ব্যাপারে কতটা নিশ্চিত হওয়া যায়, সম্ভাবনা তা প্রকাশ করে। সম্ভাবনা ০ মানে ঘটনাটি অসম্ভব; আর সম্ভাবনা ১ মানে ঘটনাটি নিশ্চিত।
১০৩ ভাগের ১ সম্ভাবনা মানে ঘটনাটি ঘটার সুযোগ এক হাজারে এক।
১০৯ ভাগের ১ সম্ভাবনা মানে ঘটনাটি ঘটার সুযোগ একশ কোটিতে এক।
১০৫০ ভাগের ১ সম্ভাবনা মানে ঘটনাটি ঘটার সুযোগ একের পরে পঞ্চাশটি শূন্যযুক্ত সংখ্যার মধ্যে এক। গণিতে এই সম্ভাবনাকে শূন্যের সমতুল্য ধরা হয়; অর্থাৎ ঘটনাটি গাণিতিকভাবে অসম্ভব।

এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য এমন মৌলিক অচলাবস্থা নিয়ে আলোচনা করা নয়, যা শুরুতেই সৃষ্টিহীনতার ধারণা বাতিল করে দেয়—যেমন পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্র, শূন্য থেকে অস্তিত্ব বা জড় থেকে প্রাণের আবির্ভাব। বরং লক্ষ্য হলো সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি থেকে পাওয়া কয়েকটি গাণিতিক হিসাব তুলে ধরা। এখানে উল্লিখিত কয়েকটি সংখ্যাই নাস্তিক দর্শন ও বস্তুবাদী তত্ত্বগুলোকে সমাহিত করার জন্য যথেষ্ট।

মহাবিস্ফোরণ: অকল্পনীয় সম্ভাবনার হিসাব


মহাবিস্ফোরণ সাধারণ কোনো বিস্ফোরণ ছিল না, যেমনটি আমরা কল্পনা করতে পারি। এটি ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম সমন্বয়ের এক বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণের প্রতিটি মুহূর্তের তাপমাত্রা, পারমাণবিক কণার সংখ্যা, সংশ্লিষ্ট বল এবং তাদের তীব্রতা—সবকিছুর মান হতে হয়েছে অত্যন্ত নির্দিষ্ট। এর একটিও সুনির্দিষ্ট না হলে আজ আমরা যে মহাবিশ্বে বাস করছি, সেটি গড়ে উঠত না।

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারজয়ী রজার পেনরোজ

মহাবিস্ফোরণের সম্ভাব্য সব ফলাফলের মধ্যে আমাদের পরিবেশটি অস্তিত্ব লাভের সম্ভাবনা রজার পেনরোজ গণনা করেছেন। বিখ্যাত ব্রিটিশ গণিতবিদ রজার পেনরোজ এই হিসাবের সময় আমাদের মতো একটি গ্রহে জীবের অস্তিত্ব ও জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত সব চলক অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
পেনরোজের হিসাবে এভাবে হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১০১০(১২৩) ভাগের ১। সংখ্যাটি এতই ক্ষুদ্র যে তার অর্থ কল্পনা করাও কঠিন।

গণিতে ১০(১২৩) বলতে বোঝায় একের পরে ১২৩টি শূন্য। এই সংখ্যাটিই গোটা মহাবিশ্বে থাকতে পারে বলে ধারণা করা মোট পরমাণুর সংখ্যার চেয়ে বেশি; সেই সংখ্যা ১০৭৮। কিন্তু পেনরোজের উত্তরের পরিসর আরও অনেক বড়: একের পরে ১০(১২৩)টি শূন্য। অন্যভাবে বললে, সংখ্যাটি লিখে শেষ করাও সম্ভব নয়—মহাবিশ্বের প্রতিটি পরমাণুতে একটি করে শূন্য লিখলেও নয়।
এই সংখ্যা নিয়ে রজার পেনরোজ মন্তব্য করেন:
“এই সংখ্যা আমাদের উপলব্ধি করায়, সৃষ্টি ও স্রষ্টার নৈপুণ্য কত সূক্ষ্ম; এর নির্ভুলতার মাত্রা ১০(১২৩)। এটি অসাধারণ একটি সংখ্যা। সাধারণ সংখ্যাপদ্ধতিতে পুরো সংখ্যাটি লেখা অসম্ভব: একের পরে ১০(১২৩)টি শূন্য থাকবে। গোটা মহাবিশ্বের প্রতিটি প্রোটন ও নিউট্রনের ওপর একটি করে শূন্য লিখলেও, এমনকি অন্য সব কণাকেও এর সঙ্গে যোগ করলেও, প্রয়োজনীয় সংখ্যাটি লিখতে জায়গা কুলাবে না।” রজার পেনরোজ, The Emperor’s New Mind, ১৯৮৯; মাইকেল ডেন্টন, Nature’s Destiny, নিউইয়র্ক: দ্য ফ্রি প্রেস, ১৯৯৮, পৃ. ৯।

সাইটোক্রোম-সি: সম্ভাবনা শূন্য

তুরস্কের অন্যতম বিখ্যাত বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী আলি দেমিরসয়ের কয়েকটি বক্তব্য একটি যথাযথ উদাহরণ। এগুলো দেখায়, নাস্তিক মতবাদের প্রতি অন্ধ আনুগত্য বিচারবুদ্ধিকে কীভাবে অসংগত করে এবং সত্য স্বীকারে বাধা দেয়। অক্সিজেননির্ভর শ্বসন সম্ভব করে এমন একটি অপরিহার্য এনজাইম সাইটোক্রোম-সি দৈবক্রমে গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন:
“সাইটোক্রোম-সি-এর একটি অনুক্রম গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের সমান। কারণ প্রাণের জন্য যদি একটি নির্দিষ্ট অনুক্রমের প্রয়োজন হয়, তাহলে বলা যায়, সমগ্র মহাবিশ্বে তা একবার ঘটতে পারে। তা না হলে আমাদের সংজ্ঞার বাইরের কোনো অধিবিদ্যক শক্তি এর গঠনে হস্তক্ষেপ করেছে বলে মানতে হয়। এই দ্বিতীয় অনুমান গ্রহণ করা বিজ্ঞানের নির্ধারিত লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তাই আমাদের প্রথম অনুমানটিই অনুসন্ধান করতে হবে।” আলি দেমিরসয়, Kalitim ve Evrim (বংশগতি ও বিবর্তন), আঙ্কারা: মেতেকসান ইয়াইনলারি, ১৯৮৪, পৃ. ৬১।

সাইটোক্রোম-সি-এর একটি অনুক্রম গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের সমান।


দেমিরসয়ের কাছে সৃষ্টির কথা বিবেচনা করার চেয়ে “শূন্যের সমান” সম্ভাবনা মেনে নেওয়াই “বেশি বৈজ্ঞানিক”। অথচ বিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারে, কোনো ঘটনার দুটি বিকল্প ব্যাখ্যার মধ্যে একটির সম্ভাবনা শূন্য হলে অন্য ব্যাখ্যাটিই সঠিক।
গোঁড়া বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এক ঊর্ধ্বতন স্রষ্টার অস্তিত্বের ধারণাকে নিষিদ্ধ করে। এই নিষেধাজ্ঞাই ওই বিজ্ঞানীকে এবং একই বস্তুবাদী মতবাদে বিশ্বাসী আরও অনেককে যুক্তিবিরোধী ধারণা মেনে নিতে বাধ্য করে। যাঁরা এসব বিজ্ঞানীকে বিশ্বাস ও ভরসা করেন, তাঁরাও এই বস্তুবাদী বলয়ে বন্দী ও অন্ধ হয়ে পড়েন। তাঁদের বই ও নিবন্ধ পড়তে পড়তে শেষ পর্যন্ত একই অনমনীয় মানসিকতা গ্রহণ করেন।

প্রোটিন


সব জীবন্ত কোষের মৌলিক গঠন-উপাদান প্রোটিন; কোষে এগুলো অসংখ্য কাজ করে। নির্দিষ্ট অনুক্রমে সাজানো অ্যামিনো অ্যাসিডের অণু দিয়ে প্রোটিন তৈরি হয়। এই অনুক্রম এতই নির্দিষ্ট যে একটি অ্যামিনো অ্যাসিডও অনুপস্থিত থাকলে বা ভুল জায়গায় বসলে পুরো প্রোটিনটি অকেজো হয়ে যায়। তাই প্রতিটি অ্যামিনো অ্যাসিডকে সঠিক অনুক্রমে ঠিক জায়গায় থাকতে হয়।
অথচ এ ধরনের অনুক্রম দৈবক্রমে গঠিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। উদাহরণস্বরূপ, ১০৩০০ =100,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,000,00। বারো ধরনের ২৮৮টি অ্যামিনো অ্যাসিড সঠিক অনুক্রমে সাজিয়ে একটি প্রোটিন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ১০৩০০ ভাগের ১—অর্থাৎ কার্যত শূন্য।

তাছাড়া, হাজার হাজার অ্যামিনো অ্যাসিড নিয়ে গঠিত বিশাল অণুগুলোর তুলনায় ২৮৮টি অ্যামিনো অ্যাসিডের প্রোটিন বেশ ছোট। একই সম্ভাবনার হিসাব ওই বিশাল প্রোটিন অণুগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে দেখা যায়, “অসম্ভব” শব্দটিও যথেষ্ট নয়।

এর ওপর, একা একটি প্রোটিনের কোনো তাৎপর্য নেই। আমাদের শরীরের কোটি কোটি লোহিত রক্তকণিকার মাত্র একটি তৈরি করতেও ২৮ কোটি হিমোগ্লোবিন অণু প্রয়োজন। হিমোগ্লোবিন ৫৭৪টি অ্যামিনো অ্যাসিডসমৃদ্ধ একটি অপরিহার্য প্রোটিন।

ডিএনএ

মানুষের বাহ্যিক চেহারা থেকে অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পর্যন্ত গঠন নির্ধারণকারী বংশগত তথ্য বিশেষ সাংকেতিক পদ্ধতিতে ডিএনএ-তে সংরক্ষিত থাকে। কাগজে এই তথ্য লিখতে হলে ৫০০ পৃষ্ঠার প্রায় ৯০০টি খণ্ড নিয়ে বিশাল একটি গ্রন্থাগার লাগবে। অথচ এই অবিশ্বাস্য পরিমাণ তথ্য আমাদের ডিএনএ-তেই সংকেতবদ্ধ আছে। মানব ডিএনএ-র এই “গ্রন্থাগার”-এর তথ্য দৈবক্রমে এসেছে বলা ততটাই অযৌক্তিক, যতটা ঢেউয়ের ধাক্কায় সৈকতে এসে পড়া নুড়িপাথর দিয়ে মানবজাতির সম্পূর্ণ ইতিহাস লেখা হয়ে যেতে পারে বলে বিশ্বাস করা।

ডিএনএ

আমাদের সব বংশগত তথ্য এই অণুগুলোতে সংরক্ষিত থাকে।
ত্রিশ বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফ্র্যাঙ্ক স্যালিসবেরি প্রাণের উদ্ভবের জন্য অপরিহার্য একটি সরল ডিএনএ অণু স্বতঃস্ফূর্তভাবে গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা হিসাব করেন। ফল এতই ক্ষীণ হয় যে একে গাণিতিকভাবে অসম্ভব ধরা হয়। ধরে নেওয়া হয়, চার বিলিয়ন বছর ধরে প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এই অণু গঠনের সুযোগ ছিল ১০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ (১০২০) অনুকূল গ্রহে। এই অবস্থায় একটিমাত্র ডিএনএ অণু গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা কত? তাঁর হিসাবে, ১০৪১৫ ভাগের ১।

মানব ডিএনএ-তে প্রায় ৩০ হাজার জিন আছে; এর একটিও দৈবক্রমে তৈরি হওয়া অসম্ভব। বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক স্যালিসবেরি স্বীকার করেন:

“মাঝারি আকারের একটি প্রোটিনে প্রায় ৩০০টি অ্যামিনো অ্যাসিড থাকতে পারে। যে ডিএনএ জিন এটি নিয়ন্ত্রণ করে, তার শৃঙ্খলে প্রায় এক হাজার নিউক্লিওটাইড থাকবে। ডিএনএ শৃঙ্খলে চার ধরনের নিউক্লিওটাইড থাকায় এক হাজার সংযোগবিশিষ্ট শৃঙ্খল ৪১০০০ভাবে বিন্যস্ত হতে পারে। সামান্য বীজগণিত, অর্থাৎ লগারিদম ব্যবহার করলেই দেখা যায়, ৪১০০০ = ১০৬০০। ১০-কে নিজের সঙ্গে ৬০০ বার গুণ করলে একের পরে ৬০০টি শূন্যযুক্ত সংখ্যা পাওয়া যায়! এই সংখ্যা সম্পূর্ণভাবে আমাদের বোধগম্যতার বাইরে।” (ফ্র্যাঙ্ক বি. স্যালিসবেরি, “Doubts about the Modern Synthetic Theory of Evolution”, American Biology Teacher, সেপ্টেম্বর ১৯৭১, পৃ. ৩৩৬)

একটি ব্যাকটেরিয়া…

নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক ও ডিএনএ বিশেষজ্ঞ রবার্ট শাপিরো একটি ব্যাকটেরিয়ায় থাকা দুই হাজার ধরনের প্রোটিন দৈবক্রমে গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা হিসাব করেন। মানবকোষে দুই লক্ষ ভিন্ন ধরনের প্রোটিন রয়েছে।
হিসাবে পাওয়া সংখ্যাটি ১০৪০,০০০ এরও বেশি। একের পরে চল্লিশ হাজার শূন্য বসালে এই অবিশ্বাস্য সংখ্যা পাওয়া যায়।

ওয়েলসের কার্ডিফে ইউনিভার্সিটি কলেজের ফলিত গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক চন্দ্র বিক্রমাসিংহে বলেন:

“জড় পদার্থ থেকে প্রাণ গঠিত হওয়ার সম্ভাবনার হিসাবে এমন একটি সংখ্যা আসে, যার একের পরে চল্লিশ হাজার শূন্য রয়েছে। ডারউইন এবং পুরো বিবর্তন তত্ত্বকে সমাহিত করার জন্য এই সংখ্যাই যথেষ্ট বড়। এই গ্রহে বা অন্য কোথাও কখনো কোনো আদিম স্যুপ ছিল না। আর প্রাণের সূচনা যদি দৈব ঘটনা না হয়, তাহলে অবশ্যই তা কোনো বুদ্ধিমত্তার ইচ্ছাকৃত সৃষ্টি।”

স্যার ফ্রেড হয়েল এই অবিশ্বাস্য সংখ্যাগুলো নিয়ে মন্তব্য করেন:

“প্রকৃতপক্ষে, এমন একটি তত্ত্ব—প্রাণ কোনো বুদ্ধিমত্তার দ্বারা সৃষ্ট—এতই সুস্পষ্ট যে আশ্চর্য হতে হয়, কেন তা সাধারণভাবে গৃহীত নয়। এর কারণ বৈজ্ঞানিকের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিকই বেশি।” ফ্রেড হয়েল ও চন্দ্র বিক্রমাসিংহে, Evolution from Space, নিউইয়র্ক: সাইমন অ্যান্ড শুস্টার, ১৯৮৪, পৃ. ১৪।

একটি কোষ


ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপদার্থবিদ হ্যারল্ড মোরোভিৎজ সবচেয়ে সরল জীবন্ত কোষের অস্তিত্ব লাভের সম্ভাবনা হিসাব করে পান ১/১০৩৪০,০০০,০০০। সংখ্যাটি সম্পূর্ণ অকল্পনীয় এবং অজ্ঞ ও বস্তুবাদীদের সব তত্ত্ব পুরোপুরি সমাহিত করার জন্য যথেষ্ট। এইচ. পি. ইয়কি, “A Calculation of the Probability of Spontaneous Biogenesis by Information Theory”, J. Theoretical Biology, ১৯৭৭, ৬৭, পৃ. ৩৩৭–৩৯৮; এইচ. জে. মোরোভিৎজ, Energy Flow in Biology, অ্যাকাডেমিক প্রেস, নিউইয়র্ক, ১৯৬৮, পৃ. ৯৯; এমিল বোরেল, Probabilities and Life, নিউইয়র্ক: ডোভার, ১৯৬২।

এবার নিজেই হিসাব করুন

ওপরের উদাহরণগুলো থেকে অকল্পনীয় সংখ্যা পাওয়া গেলেও এগুলো আসলে খুবই প্রাথমিক উদাহরণ। এই যুক্তি আরও এগিয়ে নিতে চাইলে মহাবিশ্বের প্রতিটি উপাদান সম্পর্কে একই প্রশ্ন করতে হবে। যেমন:
— মানুষের উদ্ভাবিত যেকোনো যন্ত্রের চেয়েও উন্নত চোখের আবির্ভাবের সম্ভাবনা কত?
— কানের আবির্ভাবের সম্ভাবনা কত?
— মানুষের রক্তের একটিমাত্র লাল অণু গঠনের সম্ভাবনা কত?
— দৈবক্রমে নারীর অস্তিত্ব লাভের সম্ভাবনা কত?
— দৈবক্রমে নারী ও পুরুষের মধ্যে আকর্ষণ, অর্থাৎ ভালোবাসার ব্যবস্থা গঠনের সম্ভাবনা কত? আর তার সঙ্গে অত্যন্ত জটিল কার্যপ্রণালিসম্পন্ন এমন প্রজনন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকার সম্ভাবনাই-বা কত, যার মাধ্যমে সন্তান জন্ম নিতে পারে?

প্রথম বাঘ, প্রথম হাতি, প্রথম পেঙ্গুইন কিংবা প্রথম ময়ূরের দৈবক্রমে আবির্ভাবের সম্ভাবনা কত?… এই প্রতিটি জীবের দৈবক্রমে ভিন্ন ক্ষমতা এবং বেঁচে থাকার উপযোগী বিশেষ দৈহিক গঠন অর্জনের সম্ভাবনাই-বা কত?

— প্রথম প্রোটিনটি দৈবক্রমে তৈরি হয়েছে ধরে নিলেও, আরেকটি প্রোটিন দৈবক্রমে তৈরি হওয়া পর্যন্ত সব প্রাকৃতিক প্রভাব সহ্য করে তার টিকে থাকার সম্ভাবনা কত? এভাবে দৈবক্রমে একটি কোষ গঠিত হওয়া পর্যন্ত প্রোটিনগুলোর টিকে থাকার সম্ভাবনা কত? আর সেই কোষ দৈবক্রমে গঠিত হওয়ার সম্ভাবনাই-বা কত?
— রঙের আবির্ভাবের সম্ভাবনা কত? স্বাদের আবির্ভাবের সম্ভাবনা কত?
…
এ ধরনের প্রশ্নের ধারা অনন্তকাল চলতে পারে। কারণ প্রতিটি সৃষ্টি এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রতিটি নতুন আবিষ্কারে স্রষ্টার প্রজ্ঞা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে; তাঁর কীর্তির মহিমা আমাদের মধ্যে সবচেয়ে অশিক্ষিত ব্যক্তির কাছেও প্রকাশ পায়। এভাবেই নাস্তিকতার মুখোশ উন্মোচিত হয়। নাস্তিকতা আর যুক্তি বা বিজ্ঞানের দাবি করতে পারে না, কারণ তা যুক্তি ও বিজ্ঞানের বিরোধী।

গুরুত্বপূর্ণ

এটি স্পষ্ট যে নিবন্ধে উল্লিখিত সম্ভাবনার হিসাবগুলো অকল্পনীয় সীমায় পৌঁছায় এবং তাই কার্যত অসম্ভব। তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আছে: প্রাকৃতিক পরিবেশে এসব সম্ভাবনা যাচাইয়ের সামান্যতম পরীক্ষাপর্বও শুরু হতে পারে না। কারণ প্রকৃতিতে প্রোটিন বা জীব তৈরির চেষ্টা চালায়—এমন কোনো চেষ্টা-ভুলের ব্যবস্থা নেই।
আমাদের দেওয়া হিসাবগুলো কেবল আদর্শ “চেষ্টা-ভুল” পরিবেশের জন্য প্রযোজ্য, যার বাস্তব অস্তিত্ব নেই। হিমোগ্লোবিন প্রোটিন পাওয়ার সম্ভাবনা ১০১০২৪ ভাগের ১ বলা যায় কেবল তখনই, যখন কল্পনা করা হয় এমন একটি ব্যবস্থা আছে, যেখানে অদৃশ্য কোনো হাত দৈবভাবে ৫৭৪টি অ্যামিনো অ্যাসিড একত্র করে। কাজ হলো না দেখে সেই হাত সেগুলো আলাদা করে দ্বিতীয়বার ভিন্ন ক্রমে সাজায়; এভাবে চলতে থাকে। প্রতিটি পরীক্ষায় অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো একে একে আলাদা করে নতুন ক্রমে সাজাতে হবে। ৫৭৪তম অ্যামিনো অ্যাসিড যুক্ত হওয়ার পরই সংশ্লেষণ থামাতে হবে এবং খেয়াল রাখতে হবে, অতিরিক্ত একটিও যেন যুক্ত না হয়। তারপর প্রোটিন তৈরি হয়েছে কি না যাচাই করতে পরীক্ষা থামাতে হবে। ব্যর্থ হলে সবকিছু খুলে নতুন অনুক্রম পরীক্ষা করতে হবে। তাছাড়া কোনো পরীক্ষায় একটিও বাইরের উপাদান ঢুকতে পারবে না। ৫৭৩তম বন্ধন তৈরি হওয়ার আগে পরীক্ষায় গঠিত শৃঙ্খলটিও বিচ্ছিন্ন বা ধ্বংস হওয়া চলবে না। অর্থাৎ উল্লিখিত সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে কেবল এমন নিয়ন্ত্রিত পরিবেশেই প্রযোজ্য, যেখানে সচেতন একটি ব্যবস্থা প্রক্রিয়ার শুরু, শেষ ও প্রতিটি ধাপ পরিচালনা করে; শুধু “অ্যামিনো অ্যাসিড নির্বাচন” দৈবের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রাকৃতিক পরিবেশে এমন ব্যবস্থা থাকা নিঃসন্দেহে অসম্ভব। তাই “সম্ভাবনা”র কথা বাদ দিলেও, প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রোটিনের মতো মৌলিক জীব-উপাদান গঠন যৌক্তিক ও প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের ঘটনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করাও বিজ্ঞানের আওতায় পড়ে না।

যুক্তির বদলে অবিশ্বাস বেছে নেওয়া

যাঁরা দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ বিষয় যুক্তি দিয়ে বিচার করতে পারেন, নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবার সময় তাঁরা এমন অযৌক্তিক অবস্থান নেন কীভাবে?

সমতল জমিতে হাঁটতে গিয়ে কোনো নাস্তিক যদি একটির ওপর আরেকটি রাখা তিনটি ইট দেখেন, তবে তিনি কখনো ভাববেন না যে ইটগুলো দৈবক্রমে একত্র হয়ে আবার দৈবক্রমেই একটির ওপর আরেকটি উঠে গেছে। এমন কথা কেউ বললে তাঁকে নির্বোধই মনে করা হবে।

বালুর এই দুর্গ দেখলে কোনো নাস্তিক সঙ্গে সঙ্গেই ভাববেন, এটি শিল্পকর্ম। অথচ সৃষ্টির সুস্পষ্ট প্রমাণের সামনে তিনি ঠিক উল্টো অবস্থান নেন, যদিও তা সাধারণ একটি বালুর দুর্গের চেয়েও অনেক বেশি সুস্পষ্ট।

ওপরের সংখ্যাগুলো পরিষ্কার। শুধু একটি প্রোটিনের সৃষ্টি বিবেচনা করলেই প্রমাণিত হয়, স্রষ্টা ছাড়া সেটির অস্তিত্ব লাভের সম্ভাবনা শূন্য। এখানে আমরা মহাবিশ্ব, নক্ষত্র বা কোটি কোটি প্রজাতির কথা বলছি না—শুধু ক্ষুদ্র একটি প্রোটিনের কথা বলছি।

তবু নাস্তিক দাবি করেন, কয়েক বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর আদিম পরিবেশে একটি প্রোটিন দৈবক্রমে অস্তিত্ব লাভ করেছিল। তিনি আরও এগিয়ে বিনা দ্বিধায় বলেন, শুধু একটি নয়, কোটি কোটি প্রোটিন নিছক দৈবক্রমে তৈরি হয়ে পরে প্রথম জীবন্ত কোষ গঠন করেছে। তাছাড়া অন্ধ একগুঁয়েমি নিয়ে তিনি নিজের মত সমর্থন করেন।

বিজ্ঞান বা যুক্তির নামে এই অবস্থান নেওয়া হয়—এমন দাবি করা অসম্ভব। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি দাবি করে, দুটি বিকল্পের একটির সম্ভাবনা ০.০০০০০১ শতাংশ এবং অন্যটির ৯৯.৯৯৯৯৯৯ শতাংশ হলে দ্বিতীয়টি গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু নাস্তিক শতভাগ সম্ভাবনাকে প্রত্যাখ্যান করে অসম্ভব একটি বিকল্প বেছে নেন…

উপসংহার
অতএব প্রথম অনুমানটি “শতভাগ” সত্য। সচেতন ইচ্ছার ফলেই প্রাণের অস্তিত্ব; তা “সৃষ্ট” হয়েছে। সব জীব অস্তিত্ব পেয়েছে এমন একজন স্রষ্টার মাধ্যমে, যাঁর ক্ষমতা, প্রজ্ঞা
ও জ্ঞান সবার ঊর্ধ্বে। এই বাস্তবতা কেবল একটি বিশ্বাস নয়; বিচারবুদ্ধি, যুক্তি ও বিজ্ঞান স্বাভাবিকভাবেই এই সিদ্ধান্তে নিয়ে যায়।
ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী অধ্যাপক কামিয় ফ্লামারিয়োঁর (১৮৪২–১৯২৫) বক্তব্য দিয়ে শেষ করছি:
“নাস্তিকতা এতই তুচ্ছ যে তা বিজ্ঞান বা যুক্তির পরিচয় দাবি করতে পারে না, এমনকি কোনো মতাদর্শ নামেরও যোগ্য নয়! আলোচনায় স্বীকৃত স্থান পাওয়ার পক্ষে তা অতিরিক্ত নগণ্য ও ক্ষুদ্র! নাস্তিকতা কেবল এমন মনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিভ্রম, যা শয়তানদের গোপন প্ররোচনা গ্রহণে প্রস্তুত!”